মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

পূর্ববর্তী মামলার রায়

অর্ডার সিট

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ

গ্রাম আদালত

৪নং বলীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ

উপজেলাঃ থানছি, জেলাঃ বান্দরবান।

 

বিষয়ঃ বলীপাড়া ইউনিয়নের ক্রংক্ষ্যং পাড়া গ্রামের মিসেস হাইয়ইনু মার্মা ও তাঁহার শ্বাশুড়ীসহ আত্নীয়- স্বজন মধ্যকার পারিবারিক সমস্যা ও বিবাদ সংক্রামত্ম মীমাংস করণের সালিশী বিচারের সিদ্ধামত্ম প্রদান প্রসংগে।

 

 

০১/০৯/২০১৭খ্রিঃ

                                                               

 

গত ২৫/০৮/২০১৭ইং তারিখে হাইয়ইনু মার্মা এর শ্বাশুড়ীসহ আত্নীয়-স্বজনগণ পারিবারিক সমস্যা ও বিবাদ সংক্রামত্ম সিদ্ধামত্ম গ্রহনের জন্য শ্বাশুড়ী পক্ষের মৌখিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদের বরাবরে আবেদন করেছেন। এরই প্রেক্ষিতে হাইয়ইনু মার্মা ও তাঁহার শ্বাশুড়ীসহ আত্নীয়- স্বজনদেরকে নিয়ে তাঁহাদের মধ্যকার পারিবারিক সমস্যা ও বিবাদের বিষয়ের সালিশী বিচার ব্যবস্থা করা হলো।

 

       অদ্য হাইয়ইনু মার্মা ও আত্নীয়-স্বজনদের (উসানু মার্মা, অংক্যচিং মার্মা ও মাশৈপ্রম্ন মার্মা) সকলের জবানবন্দি গ্রহণ করা হইল। তাঁহাদের জবানসমূহ পর্যালোচনা করা হলো।

       (১) উসানু মার্মা দাবী করেন যে, মৃত ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা সম্বন্ধি। আমি আমার শ্বশুড়- শ্বাশুড়ীকে সর্বদা দেখাশোনা করেছি, এখনও করে যাচ্ছি। আমার শ্বশুড় আববার নাম মংক্যউ মার্মা। আমার শ্বশুড়কে চিকিৎসার সময় সেগুন বাগান বিক্রির বাবদ মৃত ক্যচিংপ্রম্ন মার্মার পক্ষে ২০,০০০/-(বিশ হাজার) টাকা আমি দিয়েছি। যখন আমার শ্বশুড় মৃত্যু বরণ করেন তাঁহার মৃত পরবর্তী ধর্মীয় কর্মসম্পাদনের সময় ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা আমাকে ১০,০০০/-(দশ হাজার) টাকা ফেরত দিয়েছে। বাকী ১০,০০০/- (দশ হাজার টাকা) ফেরত দেয়নি। অতপর: আমার সম্বন্ধি ক্যচিংপ্রম্ন মার্মাকে গত ১৩/০৫/২০১৭ইং তারিখে ক্রংক্ষ্যং পাড়াতে চিকিৎসা করতে আনার সময় ১০,৫০০/- (দশ হাজার পাঁচশত) টাকা খরচ হয়েছে। এরপর আমার সম্বন্ধি ক্যচিংপ্রম্ন মার্মাকে ক্রংক্ষ্যং পাড়া হতে তংপ্রম্ন পাড়ায় চিকিৎসা করতে যাওয়ার সময় ৭,৫০০/- (সাত হাজার পাঁচশত) টাকা খরচ হয়েছে। বান্দরবান হিলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হলে ৪,৬০০/- (চার হাজার ছয়শত) টাকা খরচ হয়। এরপর চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এ্যাম্বুলেন্স খরচ বাবদ ৭,০০০/- (সাত হাজার) টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমানে আমার সম্বন্ধিও মৃত্যু বরণ করলেন; আমি আমার পাওনা টাকাগুলি আর ফেরত পেলাম না। অথচ আমার সম্বন্ধি ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা এর রেখে যাওয়া অনেক সম্পত্তি রয়ে গেছে। আমি আমার সকল পাওনা ও সম্বন্ধি চিকিৎসার ব্যয়সমূহ ফেরত না পেয়ে আমার বিভিন্ন জায়গায় বা প্রতিষ্ঠান হতে গ্রহণকৃত ঋণ পরিশোধ করতে পারছিনা। আমার সকল পাওনা কি আমার সম্বন্ধি ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা (মৃত) সম্পত্তি বিক্রি বা আয় উৎস থেকে উদ্ধার করা যায়না? আমার সম্বন্ধি ক্যচিংপ্রম্ন মার্মার এর সম্পত্তি কি শুধুমাত্র তাঁহার স্ত্রী- সমত্মানরা ভোগ করবে? ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা (মৃত) কর্তৃক ধারকৃত বা ঋণকৃত বা দেনা টাকা পয়সা কি ক্যচিংপ্রম্ন মার্মার এর স্ত্রী- সমত্মান পরিশোধ যোগ্য নয়? আমার শ্বাশুড়ী বর্তমানে বয়জেষ্ঠ। তাঁহার সমত্মান অকাল মৃত্যুকে একামত্মভাবে শোকাহত এবং আত্নহারা হয়ে আছেন। আমার শ্বাশুড়ী কি তাঁহার ছেলে এবং পুত্র বধু কাছ থেকে দেখাশোনা আশা করতে পারেন না!

 (২) অংক্যচি মার্মা দাবী করেন যে, আমি আমার বড় ভাই ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা কারণে শিক্ষিত হয়েছি। ডনবস্কো মিশন থেকে এস.এস.সি পাশ করার পর থেকে অনেকদিন আমার বড় ভাই ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা বাড়ীতে ছিলাম। বড় ভাইয়ের বাড়িতে পারিবারিক সমস্যা এবং ভাবির উপর তাঁহার আচরণে ক্ষুদ্ধ হয়ে আমার বড় ভাইয়ের বাড়ী থেকে অন্যত্রে ছাড়িয়া যায়। উলেস্নখ্য যে, আমি ক্ষুদ্র চাকুরী করতাম আর আমাদের সমিতি ছিল। একদিন আমার বড় ভাই ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা সকল ভাই বোনদের বলেন যে, আমরা পারিবারিকভাবে সকলে মিলে মনাই পাড়া স্থানে স’মিল করতে চাই; যা সকলে খরচ বহন করতে হবে। আমি তখন আমার গচ্ছিত টাকা ও সমিতি হতে ধার নিয়ে নগদ ৬০,০০০/- (ষাট হাজার) টাকা বড় ভাইকে দিয়েছিলাম। এখন আমার বড় ভাইতো মারা গেছেন। বর্তমানে আমার বড় ভাইয়ের সম্পত্তি রয়ে গেছে। যেহেতু আমার বড় ভাই সকল ভাই বোনদের অংশীদারিত্ত্ব নিয়ে স’মিল স্থাপন করা হয়েছে, আমরা ভাই- বোনদের ভাগিদার দাবি রাখতে পারি না?

(৩) মাশৈপ্রম্ন মার্মা জবান দেন যে, আমি ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা এর গর্ভধারিনী মা ও হাইয়ইনু মার্মা এর শ্বাশুড়ী। আমার ছেলে আমাদের সেগুন বাগান জোত করে স’মিল স্থাপন করেছিল। এখন আমার ছেলে মারা গেছেন; বেঁচে থাকার মতন আর কিছুই নাই। আমার ছেলেকে আমার পুত্র বধু দই খাওয়াইছিল। তখন থেকে আমার পুত্রের অসুখ হয়েছে বলে আমার ছেলে ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা জানিয়েছে। আমার ছেলে অসুখ হওয়ার সময় আমি বান্দরবানে তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম; তখন আমার পুত্রবধু আমাকে তাড়িয়ে দেন। কেন তাড়িয়ে দিয়েছে আমি জানিনা। আমার কি অপরাধ ছিল? আমার পুত্র বধুর এহেন আচরনে আমি মনকষ্ট পেয়েছি। আমাদের ছেলেতো মারা গেছেন; আমাদেরতো আর কিছু রইলো না।

(৪)  অপরদিকে হাইয়ইনু মার্মা জবান দেন যে, আমি ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা এর স্ত্রী বা সহধর্মীনী। আমার শ্বাশুড়ী যে আমাকে তাঁহার পুত্র বা আমার স্বামী ক্যচিংপ্রম্ন মার্মাকে দুধ বা দই খাওয়ায়ে মেরে ফেলেছেন মর্মে অভিযুক্ত করেছেন তাহা সঠিক নয়। আমাদের বাড়ীতে সব সময় দুধ খায়। আমার শ্বাশুড়ী আমাদের বান্দরবান বাড়ীতে আসত। আর বলত আমার জায়গাটি হ্লায়ইচিং মার্মা নামে একটু তাড়াতাড়ি করে দাও- এভাবে জ্বালাতন করত। জোত বাগান বিক্রি করে আমার পিতা জায়গায় বাড়ী নির্মাণ করেছিল মর্মে আমার স্বামী বেঁচে থাকার সময় বলেছিলেন। জোত বাগান টাকায় স’মিল প্রতিষ্ঠাপন করেছে মর্মে আমি জানিনা। উসানু মার্মা হইতে খরচকৃত টাকা সম্পর্কে আমি কিছু জানিনা। অংক্যচিং মার্মা আমার দেবর। সে অনেকদিন যাবত আমার বাড়ীতে ছিল। কেন আমার বাড়ী থেকে বেড়িয়ে গেল আমি জানিনা। আমার স্বামী ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা অসুস্থ থাকার সময় আমার দেবর অংক্যচিং মার্মাকে ফোন করলে পর্যমত্ম পাইনা। আমার স্বামীকে চট্টগ্রামে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেছে আমি নিজেই জানি না। আর চট্টগ্রামে আমার স্বামী মুমুর্ষ অবস্থা হলে অংক্যচিং মার্মা আমাকে ফোন করলে আমি জানি। আমার স্বামী বেঁচে থাকার সময় বলে গিয়েছিলেন তিনিই সকলের নামে গ্রম্নপল্যান্ড করে দিয়েছিলেন। অংক্যচিং মার্মা কাছ থেকে আমার স্বামী ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা যে টাকা নিয়েছেন, তাহা আমাকে কিছুই বলে যাইনি।

বিচারকমন্ডলীর সিদ্ধামত্মঃ

অদ্য বিচারকমন্ডলী এই সিদ্ধামেত্ম উপনীত হয়েছেন যে, মৃত ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা এর মনাই পাড়া স্থানে স্থাপিত স’মিল, তাঁহার দায়-দেনা ও রেখে যাওয়া সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে হাইয়ইনু মার্মা (মৃত ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা এর স্ত্রী) ও শ্বাশুড়ীসহ আত্নীয় স্বজনদের মধ্যকার পারিবারিকভাবে সমস্যা ও বিবাদটি উদ্ভব হয়েছে। বিচারকমন্ডলী সুস্থ বিচার স্বার্থে সকলকে জানাচ্ছে যে, উত্তরাধিকার সূত্রে কোন ব্যক্তির সম্পত্তি তাঁহার ওয়ারীশগণ ভোগ করার ক্ষমতাধিকারী হবেন। বিধায়, মৃত ক্যচিংপ্রম্ন মার্মার সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি শুধুমাত্র তাঁহার স্ত্রী হাইয়ইনু মার্মা (যতদিন পর্যমত্ম তিনি অন্য কোন পুরম্নষকে বিবাহ না করেন) ও কন্যা নুক্রেউ মার্মা ভোগ করার ক্ষমতা থাকিবে।

বিচারকমন্ডলী চিমত্মাশীলগতভাবে সিদ্ধামত্ম গ্রহণ করেছে যে, মৃত ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা এর ধারকৃত ও তাঁহার চিকিৎসার বাবদ উসানু মার্মা (ক্যচিংপ্রম্ন ছোট বোনের স্বামী) হইতে সর্বমোট ৩৯,৬০০/- (ঊনচলিস্নশ হাজার ছয়শত) টাকা খরচ হয়েছে ও তাঁহার স’মিল প্রতিস্থাপন সময় ছোট ভাই অংক্যচিং মার্মা কাছ থেকে ৬০,০০০/- (ষাট হাজার) টাকা নিয়েছে মর্মে সুস্থ বিচার স্বার্থে গন্য করা হলো। অপরদিকে মাশৈপ্রম্ন মার্মাকে তাঁহার সমত্মান ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা এর মৃত্যুর সম্পর্কে অহেতুক বিরক্তিমূলক বক্তব্য বা কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।

বিচারকমন্ডলী পরিশেষে এই সিদ্ধামত্ম প্রদান করছে যে, হাইয়ইনু মার্মাকে তাঁহার মৃত ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা এর চিকিৎসার খরচ বাবদ উসানু মার্মাকে ৩৯,৬০০/- (ঊনচলিস্নশ হাজার ছয়শত) টাকা ও ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা তাঁহার ছোট ভাই অংক্যচিং মার্মা থেকে গ্রহণকৃত ৬০,০০০/- (ষাট হাজার) টাকাসমূহ আগামী ০৬(ছয়) মাসের মধ্যে ২কিসিত্মতে পরিশোধ করে দেওয়ার জন্য আদেশ করা হলো। নিজ স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর সম্পত্তি ভোগ করিলে স্বামীর পিতা-মাতাকে দেখাশোনা ভার স্ত্রীকে বহন করতে হয়ে থাকে। বিধায়, শ্বাশুড়ী মাশৈপ্রম্ন মার্মাকে দেখাশোনার ভার হিসেবে প্রতিমাসে ১,৫০০/- (এক হাজার পাঁচশত) টাকা শ্বাশুড়ীর আমরণ পর্যমত্ম মাসের ৩০ তারিখের ভিতরে পরিশোধ করে যাওয়ার জন্য আদেশ প্রদান করা হলো। তাছাড়া, ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা জীবিত থাকার কালীন তাঁহার পিতা-মাতা বা অন্য কাহারো জায়গা জমি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা হলে সেগুলো যথাযথাভাবে ব্যাংক থেকে উদ্ধার করে জায়গার মালিক বা পক্ষকে আগামী ০৬ (ছয়) মাসের মধ্যে ফেরত প্রদানের জন্য হাইয়ইনু মার্মাকে নিদের্শ দেয়া হলো। এরই সাথে ক্যচিংপ্রম্ন মার্মা জীবিত থাকার কালীন যে কাহারো জায়গা- জমি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখুক না কেন, সেগুলো উদ্ধারের হাইয়ইনু মার্মাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাটুকু করার জন্য শ্বাশুড়ীসহ সকল আত্নীয় স্বজনদেরকে নিদের্শ দেয়া হলো।  

          বিচারকমন্ডলী হাইয়ইনু মার্মাকে অযথা তাঁহার শ্বাশুড়ীকে বান্দরবান বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেয়া ও অন্যান্য সময় শ্বাশুড়ীকে তাঁহার মনোকষ্ট ও অসন্তুুষ্টি আচরণের জন্য অদ্যকার বিচার সালিশ সভায় বিনম্রভাবে শ্বাশুড়ী মাশৈপ্রম্ন মার্মা কাছে ক্ষমা চাওয়া জন্য নিদের্শ প্রদান হইল।

        অদ্য উভয় পক্ষকে পারস্পরিক সৌহাদ্যপূর্ণভাবে হিংসা, ক্রোধ পরিহার করে সৎ জীবন যাপনের জন্য নির্দেশ প্রদান করে বিচার নিস্পত্তি হয় মর্মে নথিভুক্ত করা হল।

(জিয়াঅং মার্মা)

চেয়ারম্যান

৪নং বলীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ

থানছি, বান্দরবান পাবর্ত্য জেলা।

 

ছবি


সংযুক্তি




Share with :

Facebook Twitter